ঋতুচক্রে ফাল্গুনের শেষবেলা, এখনো প্রকৃতিতে কিছুটা শীতের আমেজ। এই শীতের মিষ্টি রোদ গাঁয়ে মেখে হাতে হাতে পুঁটি মাছের শুঁটকি তৈরি ব্যস্ত সময় পার করছে লিলি- শাহিদার মতো গৃহিনীরা। স্বামী সংসারে টানাপোড়ার দশা থেকে একটু পরিত্রাণ পেতে শুঁটকি দিয়ে প্রয়োজনীয় চাহিদাগুলো মিটিয়ে যাচ্ছেন হাওরের এসব বাসিন্দারা।
শুকনো হাওরের বুকে খোলা মাঠে খেটে-খাওয়া মানুষের এমনি জীবন সংগ্রাম শ্রীভূমি সিলেটে খুবই বিরল চিত্র।
সিলেটের হরিপুরে শুকনো হাওরের মাঠে প্রায় ৩০জন নানা বয়সের নারী এখন পুঁটি শুঁটকি তৈরিতে ব্যস্ত। বছরের ৬ মাস পানির নীচে থাকা হাওরগুলো এখন শুকনো। যেন চর জেগেছে হাওরের বুকে। আর এসব শুষ্ক স্থানে আবাদি জমির বাইরে শুটকি শুকান তারা।
দিন মজুরি স্বামীদের সংসারের প্রয়োজনীয় চাহিদা একটু মিটিয়ে নিতে শুঁটকি তৈরির কাজে নেমেছে। এ থেকে মাসে মজুরি পাই জনপ্রতি ১২শ’ থেকে ২৫শ’ টাকা। মৌসুমী ভেদের মাছের শুঁটকি সৃষ্টের কাজ বছরের অর্ধ ছয় মাসের।
যদিও এই কাজের তেমন একটা আয় না হলেও পুঁটি শুঁটকি দিয়ে ভাগ্য পরিবর্তন করতে চাই বলেন, লিলি বেগম (২০)। এই গৃহিনী বলেন, পুঁটি দিয়ে কিভাবে ব্যবসায় উন্নতি করা যায় তার কাজ শিখেছি। হাতে যদি অনেক টাকা থাকতো, তাহলে এই শুঁটকি ব্যবসা তা নিজের করা যেতো। এই কাজ মাত্র ছয় মাসের জন্য। যে যত বেশি মাছের শুঁটকি তৈরি করতে পারে, তার ততো বেশি মজুরি।
তিনি আরো বলেন, দশজনের সংসারে অনেক টানাপোড়া। তাই এই কাজ করে যাচ্ছি ২বছর ধরে একটু আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরে পেতে। একই স্থান থেকে গৃহিনী শাহিদা বেগম (৩৫) বলেন, স্বামী আমার কৃষক। তা দিয়ে সংসার চলতে হিমশিম খেতে হয়। শুঁটকি তৈরি করে টুকটাক ইনকাম দিয়ে দুই সন্তানের প্রয়োজনীয়গুলো মিটিয়ে নিতে পারছি। তবে এই কাজ শুধু ছয় মাছের জন্য।
আরেক গৃহিনী রশিদা বেগম (৪০) জনান, এখানে পুঁটি শুঁটকি তৈরি শুরু হয়েছে প্রায় ২ বছর ধরে। সংসারের কাজ কর্মের পাশাপাশি এই শুঁটকি তৈরি কাজ করে যাচ্ছি। প্রথমে পুঁটি মাছকে কেটে ভালো ভাবে ঢুয়ে লবন দিতে হয়। এরপর ৩/৪দিন মাছগুলোকে রোদে শুকানো হয়। পরে শুকনো মাছগুলো মটকাতে ভরে ৬ মাস ব্যাপী পঁচিয়ে রেখে শুঁটকিতে রুপান্ত করা হয়।
হরিপুরের পুঁটি শুঁটকির স্বত্ত্বাধিকার ব্যবসায়ী মো. সুলতান মিয়া (৬০) প্রতিবেদককে বলেন, হরিপুরের পুঁটি শুঁটকি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রি করে যাচ্ছি প্রায় দুই বছর ধরে। শুরুতে হাতে ১০ লাখ টাকা নিয়ে শুধু পুঁটি শুঁটকির ব্যবসায় দাঁড়িয়েছি। দুই বছরের মাথায় এখন মাছের শুঁটকি ব্যবসায় যোগান করেছি প্রায় ২৫লাখ টাকা মতো। ঘরের নারীরা ভালো করে শুঁটকি তৈরি করতে পারে। তাই এই কাজে শুধু নারীদের রেখেছি। যে যত বেশি শুঁটকি তৈরি করতে পারবে। তার মজুরী ততো বেশি দেওয়া হয়। চাইলে ওরাও এই ব্যবসা শুরু করতে পারে।