সঞ্চয়পত্রে গ্রাহকের আস্থা বাড়ছে

::
প্রকাশ: ১০ মাস আগে
সংগৃহীত ছবি

ব্যাংক আমানতের সুদহারের চেয়ে সঞ্চয়পত্রের সুদহার দ্বিগুণ বেশি। নিরাপদ ও লাভজনক বিনিয়োগ হওয়ায় এখন সঞ্চয়কারীরা এটিকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন। অবসরপ্রাপ্ত ও মধ্যবিত্তদের অনেকেই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সুদ দিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি বেড়েছে প্রায় আটগুণ।
জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদফতরের তথ্য মতে, দেশে বর্তমানে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র রয়েছে। এগুলো হলো-পেনশনার সঞ্চয়পত্র, পরিবার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্র ও তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র। এর মধ্যে তিনটি পাঁচ বছর মেয়াদি এবং একটি তিন বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্র।
জাতীয় সঞ্চয় ব্যুরো, বাংলাদেশ ব্যাংকের সব শাখা, সব বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং ডাকঘর থেকে সঞ্চয়পত্র ক্রয় ও নগদায়ন করা যায়। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে কেউ চাইলে সঞ্চয়পত্র ভেঙে টাকা উঠিয়ে ফেলতে পারেন। সে ক্ষেত্রে বছর অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে মুনাফা পাওয়া যাবে।
নতুন আয়কর আইনে সঞ্চয়পত্রের মোট মুনাফার ওপর অতিরিক্ত কর আরোপে নতুন নিয়ম করা হলেও সেটি প্রত্যাহার করে নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এখন থেকে আগের মতোই ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার ওপর কোনো উৎসে কর দিতে হবে না। এর অধিক হলে মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর দিতে হবে।
জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদফতরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে সঞ্চয়পত্র থেকে নিট ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা এসেছে। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আটগুণ বেশি। ২০২২-২৩ অর্থবছরের জুলাইয়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল ৩৯৩ কোটি টাকা।
হঠাৎ নিট বিক্রি বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের পরিচালক (অর্থ ও পরিকল্পনা) মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম  বলেন, সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা এবং বেশি লাভের প্রত্যাশা করে। সঞ্চয়পত্রে এই দুটিই রয়েছে। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ যেমন নিরাপদ তেমনি ব্যাংকের চেয়ে মুনাফা বেশি পাওয়া যায়। আমাদের চারটি স্কিমের সব মুনাফাই ১১ শতাংশের বেশি। সে জন্য মানুষ সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকছে বলে আমি মনে করি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর বাড়তি কর আরোপ থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত মানুষকে সঞ্চয়পত্র বিনিয়োগে উৎসাহ জোগাবে। সঞ্চয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে নানামুখী কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, মানুষ অবসরের শেষ সম্বল সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেন। সঞ্চয়পত্র থেকে তারা যে সুদ পান তা দিয়ে তাদের খরচ চলে। সঞ্চয়পত্রের বাড়তি কর প্রত্যাহার করে নেওয়া ভালো সিদ্ধান্ত। মূল্যস্ফীতির এই সময়ে এই কর মানুষের কষ্ট আরও বাড়াত। সঞ্চয়পত্রের সুদ যেহেতু দেশের মানুষ পায়, এই সুদের টাকাও দেশেই থাকে সে জন্য সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমানো উচিত নয়। কোন সঞ্চয়পত্রে কেমন মুনাফা-

পেনশনার সঞ্চয়পত্র : এই সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ পাঁচ বছর। পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ হলে এই সঞ্চয়পত্রে ৫০ হাজার থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত মুনাফা পাওয়া যাবে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ হারে। ১৫ লাখ ১ টাকা থেকে শুরু করে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয় করলে পাওয়া যাবে ১০ দশমিক ৭৫ শতাংশ মুনাফা। ৩০ লাখ ১ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনলে মেয়াদ শেষে মুনাফা পাওয়া যাবে ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ মুনাফা।
এই সঞ্চয়পত্র অবসরপ্রাপ্ত সরকারি, আধা-সরকারি স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী, সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারগতি, সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য এবং মৃত চাকরিজীবীর পারিবারিক পেনশন সুবিধাভোগী স্বামী-স্ত্রী, সন্তান। এক নামে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা যাবে।
পরিবার সঞ্চয়পত্র : এর মেয়াদ পাঁচ বছর। পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ হলে এই সঞ্চয়পত্রে ১০ হাজার থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত মুনাফা পাওয়া যাবে ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ। ১৫ লাখ ১ টাকা থেকে শুরু করে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয় করলে পাওয়া যাবে ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ মুনাফা। ৩০ লাখ ১ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনলে মেয়াদ শেষে মুনাফা পাওয়া যাবে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ মুনাফা। প্রাপ্ত বয়স্ক যেকোনো নারী, শারীরিক প্রতিবন্ধী (পুরুষ ও মহিলা)। ৬৫ ও তদূর্ধ্ব পুরুষ ও নারী উভয়ই এই সঞ্চয়পত্র কিনতে পারবেন। এক নামে সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কেনা যাবে।
পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্র : পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ হলে এই সঞ্চয়পত্রে ১০ হাজার টাকা থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত মুনাফা পাওয়া যাবে ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ। ১৫ লাখ ১ টাকা থেকে শুরু করে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয় করলে পাওয়া যাবে ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ মুনাফা। ৩০ লাখ ১ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনলে মেয়াদ শেষে মুনাফা পাওয়া যাবে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ মুনাফা।
দেশের সব শ্রেণি পেশার মানুষ। ভবিষ্যৎ তহবিল। মৎস্য, হাঁস-মুরগির খামার, পোল্ট্রি ফিডস উৎপাদন, বীজ উৎপাদন, স্থানীয় উৎপাদিত বীজ বিপণন, গবাদি পশুর খামার, দুগ্ধজাত দ্রব্যের খামার, ব্যাঙ উৎপাদন খামার, উদ্যান খামার প্রকল্প, রেশম গুটিপোকা পালনের খামার, ছত্রাক উৎপাদন এবং ফল ও লতাপাতার চাষ থেকে অর্জিত আয় যা সংশ্লিষ্ট উপ-কর কমিশনার কর্তৃক প্রত্যায়নকৃত। এক নামে ৩০ লাখ টাকা এবং যুগ্ম নামে ৬০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কেনা যাবে। তবে প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কোনো সীমা নেই।
তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র : তিন বছর মেয়াদ পূর্ণ হলে এই সঞ্চয়পত্রে ১ লাখ টাকা থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত মুনাফা পাওয়া যাবে ১১ দশমিক ০৪ শতাংশ। ১৫ লাখ ১ টাকা থেকে শুরু করে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয় করলে পাওয়া যাবে ১০ শতাংশ মুনাফা। ৩০ লাখ ১ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনলে মেয়াদ শেষে মুনাফা পাওয়া যাবে ৯ শতাংশ মুনাফা।
অটিস্টিকদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান/অন্য যেকোনো অটিস্টিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান (যাদের সঞ্চয়পত্রের মুনাফা অবশ্যই অটিস্টিকদের সহায়তায় ব্যবহার করতে হবে)।
একক নামে ৩০ লাখ টাকা এবং যুগ্ম নামে ৬০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কেনা যাবে। তবে প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কোনো সীমা নেই।