রাজধানীতে চুরি করে ওরা গ্রামে যায় বিমানে!

:: পাবলিক রিঅ্যাকশন রিপোর্ট | পাবলিকরিঅ্যাকশন.নেট
প্রকাশ: ৫ মাস আগে
‘ভিআইপি’ চোর চক্রের সদস্যরা

কক্সবাজারের চকরিয়ার মধ্যম কোনাখালীর ছেলে নোমান। তার নেতৃত্বে সক্রিয় ‘ভিআইপি’ চোর চক্র। এই গ্রুপে রয়েছে ৪০ জন সদস্য। তারা সবাই রাজধানী ঢাকায় ফ্ল্যাটে থাকেন আর ঘুরে ঘুরে চুরি করে বেড়ান।

গ্রামের বাড়ি যান উড়োজাহাজে চেপে। চোরাই মোবাইল ফোন বেচাকেনার জেরে এক কলেজছাত্র খুনের রহস্য ভেদ করতে গিয়ে পুলিশ খুঁজে পেয়েছে এই ‘ভিআইপি’ চোরের দলকে। এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন দলের প্রধান নোমানসহ তিনজন।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সাল থেকে এই গ্রুপ সক্রিয়। একসময় তাদের দলনেতা ছিলেন রিদওয়ান। একাধিক মামলায় কারাভোগের পর তিনি এই পথ ছাড়েন। এরপর দলনেতা হিসেবে রিদওয়ানের পদটি নেন নোমান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই চোর চক্রের নিজস্ব কৌশল রয়েছে। দলে টানার পর নোমান প্রথমে সবাইকে প্রযুক্তি সম্পর্কে ভালো ধারণা দেন। চুরির পর একটি মোবাইল কীভাবে দ্রুত ‘রিসেট’ ও ‘আইএমইআই’ নম্বর বদল করতে হয় সেটি শেখানো হয়। এছাড়া দলে টানার পর শুরুতে চোর চক্রের মূল দলে রাখা হয় না নতুনদের।

প্রথমে গাড়ির যাত্রীদের টার্গেট করে টানা পার্টির সদস্য হয়ে কাজ করতে হয়। সেখানে পারদর্শিতা দেখালে বাসাবাড়িতে চুরির কাজে নিযুক্ত করা হয়। কেউ ধরা পড়লে তাকে জামিনে ছাড়িয়ে আনার কাজও এই চক্রের সদস্যরা করেন।

চকরিয়ায় কোনাখালীর নোমানের সঙ্গে আরও যারা চোর চক্রে কাজ করে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন ছড়াপাড়ার মো. মোবারক, বখতিয়ার, বোরহান, আমজাদ, দানু, সাইফুল ইসলাম, সোহেল, রমিজ রানা, মুবিন, ফারুক ও সোহান। গাবতলী, উত্তরা ও সবুজবাগ এলাকায় তারা আলাদা বাসা নিয়ে চুরি করে আসছিলেন।

চক্রের একটি গ্রুপ বছরজুড়ে ঘুরে ঘুরে ঢাকায় বাস করেন। আর মধ্যরাত থেকে টার্গেট করা বাড়িতে হানা দেন তারা। চুরির মিশন শেষে চোরাই মালপত্র কুরিয়ারে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপর সেখানে তারা এসব বিক্রি করেন। কক্সবাজারের সালাউদ্দিন নামে এক ব্যবসায়ী নিয়মিত চোরাই পণ্য কেনাবেচা করে আসছেন। সালাউদ্দিনকে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

এদিকে গত ১ ডিসেম্বর কক্সবাজার সিটি কলেজের ছাত্র আসবাহুল ইসলাম জিহাদকে হত্যা করেন নোমান ও তার সঙ্গীরা। চোরাই মোবাইলফোন কেনার বিষয়টি জেনে টাকা ফেরত চাওয়ায় খুন হতে হয়েছে জিহাদেকে।

জানা গেছে, দামি মোবাইল ফোন কেনার জন্য একদিন মায়ের কাছে আবদার করেন জিহাদ। পরে নোমানের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকায় ফোনসেটও কেনেন তিনি। তবে কয়েক দিন পরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ফোন ট্র্যাক করে জিহাদকে জানায়, তার সেটটি চোরাই ফোন। এরপর তিনি ফোনটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেন।

এরপরই চোরাই ফোন কিনে ফেঁসে যাওয়ায় নোমানের কাছ থেকে টাকা ফেরত চান জিহাদ। ১০ হাজার টাকা ফেরতও দেন। তবে বাকি টাকা ফেরত দিতে শুরু করেন গড়িমসি। এরপরই টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে জিহাদকে ডেকে নিয়ে ধারালো অস্ত্র, ছোরা ও লোহার রড দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকেন। বুকের বাঁ পাশে ছুরি দিয়ে জখমও করা হয়। এরপর আশপাশের লোকজন জিহাদকে পেকুয়া হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। চোরাই মোবাইল ফোন কিনে নিরপরাধ কলেজছাত্রকে যেভাবে নির্মমভাবে প্রাণ হারাতে হয়েছে, তাদের ব্যাপারে খোঁজ নিতে গিয়ে বেরিয়ে আসে এসব তথ্য।

গোয়েন্দা পুলিশের মিরপুর বিভাগের ডিসি মানস কুমার পোদ্দার বলেন, কক্সবাজারকেন্দ্রিক যে গ্রুপটির খোঁজ মিলেছে। এদের মূল পেশা চুরি। দামি ইলেকট্রনিকস জিনিসপত্র চুরি করাই তাদের নেশা।

তিনি আরও বলেন, এই চোর চক্রের সদস্যরা এক জায়গায় বেশি দিন বাসা ভাড়া করে থাকেন না। মধ্যম কোনাখালী ও আশপাশের কয়েকটি গ্রাম থেকে তরুণদের ঢাকায় এনে চোর চক্রে ঢোকানো হয়। তাদের অধিকাংশের বয়স ১৮ থেকে ২৫-এর মধ্যে।

চোর চক্রের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে গোয়েন্দা তথ্য রাখছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের মিরপুর বিভাগের সহকারী পুলিশ সুপার সালাউদ্দিন খান নাদিম।

তিনি বলেন, কক্সবাজারে কলেজছাত্র খুনের পরই জড়িতদের ব্যাপারে ছায়াতদন্ত করে নোমান ও তার গ্রুপের সংশ্লিষ্টতার সুনির্দিষ্ট তথ্য মেলে।

চকরিয়ায় চোর চক্রের হাতে নিহত কলেজছাত্র জিহাদের বাবা মকছুদুল করিম বলেন, ‘আমার কলিজার টুকরোকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এই শোক কীভাবে ভুলব। ছেলের খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’