নিরব বা চুপ থাকার গুরুত্ব

:: হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী ::
প্রকাশ: ১১ মাস আগে

১/রাসুলে পাক (সাঃ) এরশাদ করেছেন-যে নিরব থাকে সে মুক্তি পায়। -(তিরমিযি) অন্য রেওয়াতে আছে। নিরব থাকা হল হেকমত ও প্রজ্ঞা।(কিন্তু) কম লোকই উহার উপর আমল করে।

২/হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সুফিয়ানের পিতা বর্ননা করেন, একবার আমি রাসুলে পাক (সাঃ) এর খেদমতে আরজ করলাম,ইসলাম সম্পর্কে আমাকে এমন কোন কথা বলে দিন যেন আপনার পরে আর কাহারও নিকট কিছু জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন না হয়।আমার এ নিবেদনের জবাবে তিনি এরশাদ করলেন,বল, আল্লাহর উপর ইমান আনিলাম। অতপর এই ইমানের উপর কায়েম থাক।আমি আরজ করিলাম হে আল্লাহর রসুল আমি কোন বিষয় হতে বাচিয়া থাকিব ? জবাবে তিনি জিহ্বার দিকে ইশারা করে বললেন,ইহা হতে বেচে থাক।”-তিরমিযি,নাসাঈ,ইবনে মাজা,মুসলিম)।

৩/হযরত উকবা বিন আমের (রাঃ) বলেন,একবার আমি নবী করিম সাঃ এর খেদমতে আরজ করলাম,নাজাতের উপায় কি ? তিনি রাসুল (সাঃ) এরশাদ করলেন,”জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রনে রাখ,তোমার ঘর যেন তোমার জন্য যথেষ্ট হয়(অর্থাৎ ঘর হতে বের হয়ো না) এবং নিজের গুনাহের জন্য (অনুশোচনার) অশ্রু বর্ষন কর।”-তিরমিযি।

৪/আল্লাহর হাবিব সাঃ এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আমাকে উভয় কানের মধ্যখানের বস্তু(অর্থাৎ জিহ্বা) এবং দুই রানের মধ্য স্হানের বস্তু অর্থাৎ লজ্জাস্হানের নিশ্চয়তা দিবে,আমি তাকে জান্নাতের নিশ্চয়তা দিব।- বোখারী।

৫/একবার নবী করিম (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করা হলো, কোন বিষয়ের কারনে মানুষ অধিক পরিমানে জান্নাতে যাবে ? জবাবে তিনি রাসুল সাঃ এরশাদ করলেন- আল্লাহর ভয় ও সচ্চরিত্রতার কারনে।” পুনরায় আরজ করা হলো, সেই বিষয়টিও বলে দিন যার কারনে মানুষ জাহান্নামে যাবে। এরশাদ হলো – ”দুটি খালি বস্তুর কারনে- মুখ ও ল্জ্জাস্হান।”-(তিরমিযি,ইবনে মাজা)।

৬/একদা হযরত আব্দুল্লাহ সকাফী (রাঃ) নবী পাক (সাঃ) এর খেদমতে আরজ করলেন,হে আল্লাহর রাসুল(সাঃ) আপনি আমার সম্পর্কে কোন বিষয়টি অধিক আশংকা করতেছেন ? জবাবে রসুল পাক সাঃ স্বীয় জিহ্বা মোবারক স্পর্শ করে বললেন, ইহা সম্পর্কে ।(নাসাঈ)

৭/হযরত মোয়ায বিন জাবাল রাঃ রাসুলে পাক (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলেন, সর্বোত্তম আমল কোনটি ? জবাবে রাসুলে পাক সাঃ নিজের জিহ্বা মোবারক বের করে উহার উপর আঙ্গুল স্হাপন করলেন(অর্থাৎ নিরব থাকা সর্বোত্তম আমল) তাবরানী,ইবনে আবিদ্দুনয়া।

৮/অনত্র রাসুল পাক (সাঃ) বলেন,”যে ব্যক্তি শান্তি পছন্দ করে ,সে যেন নীরবতা অবলম্বন করে।”-বায়হাকী,-ইবনে আবিদ্দুনয়া।

৯/একদা রাসুল পাক (সাঃ) এরশাদ করেন,”যখন সকাল হয় তখন মানুষের সকল অঙ্গ জিহ্বাকে বলে,আমাদের বিষয়ে তুমি আল্লাহকে ভয় কর;তুমি ঠিক থাকলে আমরাও ঠিক থাকবো,তুমি বক্র হলে আমাদের অবস্হাআও অনুরুপ হবে।
–তিরমিযি শরীফ।

১০/হযরত ইবনে মাসুদ রাঃ হতে বর্নীত যে ,তিনি সাফা পাহারে আরোহন করে তালবিয়া পাঠ করছিলেন এবং নিজের জিহ্বাকে লক্ষ করে বলতেছিলেন- হে জিহ্বা ভাল কথা বল,লাভবান হবে এবং অনিষ্ট হতে নিরব থাক,বিপদমুক্ত থকবে।লোকেরা তাকে জিঙ্গেস করলো,াপনি যা বলতেছেন,ইহা কি আপনার নিজের কথা,না অপর কাহারো নিকট শুনেছেন ?তিনি বললেন,আমি নবী করিম সাঃকে বলতে শুনেছি,”বনী আদমের অধিকাংশ গুনাহ হলো টার জিহ্বার মধ্যে।”(-তাবরানী,বাঈহাকি।)

১১/হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা:) নিম্নের হাদীসটি বর্ণনা করেন-”যেই ব্যক্তি নিজের জিহ্বা সংযত রাখে,আল্লাহ পাক তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখেন । যেই ব্যক্তি ক্রোধ দমন করে, আল্লাহ পাক তাকে আযাব হতে রক্ষা করেন । যে ব্যক্তি আল্লাহ পাকের নিকট ওজর করে,আল্লাহ পাক তাহার ওজর কবুল করেন ।

১২/একদা হযরত মোয়াজ ইবনে জাবাল (রা:) নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে আরজ করলেন, ”হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আমাকে কিছু ওসীয়ত করুন । হযরত মোয়াজের নিবেদনের জবাবে আল্লাহর নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করলেন: ”তুমি এমনভাবেআল্লাহ পাকের এবাদত কর যেন আল্লাহকে দেখছ । নিজের নফসকে মৃতদের মধ্যে গন্য কর । তুমি যদি চাও,তবে আমি তোমাকে এমন বিযয় বলবো যা এই সমুদয় বিষয় আপেক্ষা উত্তম ; তিনি হাত দ্বারা নিজের জিহ্বার দিকে ইশারা করলেন ।”(ইবনে আবিদ্দুন্য়া,তাবরানী)

১৩/হযরত সাফওয়ান বিন সলীম (রা:) হইতে বর্ণিত, একদা নবী করীম সা: এরশাদ করলেন: আমি কি তোমাদিগকে এমন এবাদতের কথা বলবো না, যা খুবই আছান হযরত আবু হোরায়রা (রা:) হইতে বর্ণিত,রাসূলে করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-”যে ব্যক্তি আল্লাহকে এবং পরকালকে বিশ্বাস করে, সে যেন ভাল কথা বলে অথবা নীরব থাকে ।

১৪/হযরত হাসান বসরী (রহ:) বলেন, আমার নিকট নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বানী নকল করা হয়েছে যে, আল্লাহ পাক সেই ব্যক্তির উপর রহম করুন যে কথা বলিলে উপকারী কথা বলে এবং নীরবতা দ্বারা নিরাপত্তা লাভ করে ।(বায়হাকী)

১৫/এক ব্যক্তি হযরত ঈসা (আ:)- এর খেদমতে আরজ করল; আমাকে এমন কোন আমল বলে দিন, যা দ্বারা আমি বেহেশ্ত লাভ করতে পারব । তিনি বললেন, তুমি কখনো কথা বলিও না । লোকটি আরজ করলো, ইহা তো সম্ভব নহে । তিনি বললেন, তুমি ভাল কথা ব্যতীত অন্য কিছু বলিও না ।” হযরত সুলাইমান (আ:) বলেন,(মনে কর) কথা বলা যদি রুপা হয়,তবে চুপ থাকা যেন স্বর্ণ ।

১৬/এক বেদুঈন নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খদমতে হাজির হয়ে আরজ করলো, আমাকে এমন কোন আমল বলে দিন যা দ্বারা আমি জান্নাত লাভ করতে পারবো ।আল্লাহর নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করলেন: অভুক্তকে আহার করাও, পিপাসার্তকে পানি পান করাও, সৎকাজের আদেশ কর এবং অসৎ কাজ হইতে নিষেধ কর । তুমি যদি এইরুপ করতে না পার, তবে ভাল কথা ব্যতীত অন্য কোন কথা বলিও না ।(ইবনে আবিদ্দুন্য়া।

১৭/এক হাদীসে আছে-নিজের জিহ্বাকে কল্যানকর কথা ব্যতীত অন্য সকল কথা হইতে বিরত রাখ, ফলে তুমি শয়তানের উপর প্রবল থাকবে ।(তাবরানী,ইবনে হিব্বান)

এক রেওয়ায়েতে আছে,নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন:মানুষ তিন প্রকার!

১।গনিমত আহরনকারী- যে আল্লাহকে স্বরন করে।

২।বিপদ আপদ হতে নিরাপদ-যে চুপ থাকে।

৩।ধ্বংস প্রাপ্ত-যে বাতিলের মধ্যে লিপ্ত।
(তাবরানী,

মোমিনের জিহ্বা অন্তরের পিছনে।সে কথা বলার পুর্বে চিন্তা করে তবে কথা বলে।পক্ষান্তরে মোনাফেকের জিহ্বা অন্তরের আগে থাকে।সে চিন্তাভাবনা করে কথা বলে না।যাহা মনে আসে তাহাই বলে।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সবাইকে উত্তম ইসলামিক কথা বলার অথবা নিরব থাকার তাওফিক দান করুন আল্লাহুম্মা আমিন।

লেখক: হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী; বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ লেখক ও কলামিস্ট।